আইসিডিডিআর,বি: ঢাকার শিশুরা দিনে গড়ে ৫ ঘণ্টা স্ক্রিনে, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি
ঢাকার শিশুরা প্রতিদিন গড়ে ৫ ঘণ্টা স্ক্রিনে, উদ্বেগজনক তথ্য আইসিডিডিআর,বি-র গবেষণায়
ঢাকার স্কুলপড়ুয়া শিশুদের মধ্যে ডিজিটাল স্ক্রিন ব্যবহারের হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। আইসিডিডিআর,বি পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীর বেশিরভাগ শিশু প্রতিদিন আন্তর্জাতিকভাবে সুপারিশকৃত সীমার অনেক বেশি সময় স্মার্টফোন, ট্যাবলেট, টেলিভিশন, কম্পিউটার ও গেমিং ডিভাইসে কাটাচ্ছে। এর ফলে তাদের ঘুম, শারীরিক স্বাস্থ্য এবং মানসিক সুস্থতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পরিচালিত এই গবেষণায় ঢাকার তিনটি বাংলামাধ্যম ও তিনটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী ৪২০ জন শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। গবেষণার ফলাফল সম্প্রতি জার্নাল অব মেডিকেল ইন্টারনেট রিসার্চ (JMIR) Human Factors-এ প্রকাশিত হয়েছে।
প্রতিদিন প্রায় ৫ ঘণ্টা স্ক্রিনে
গবেষণায় অংশ নেওয়া শিশুদের সঙ্গে সাক্ষাৎকার, শারীরিক পরীক্ষা এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিভিন্ন মূল্যায়ন পদ্ধতির মাধ্যমে তাদের স্ক্রিন ব্যবহারের সময়, ঘুম, শারীরিক অবস্থা এবং মানসিক স্বাস্থ্য বিশ্লেষণ করা হয়।
ফলাফলে দেখা যায়—
-
প্রতি ৫ জন শিশুর মধ্যে প্রায় ৪ জন (৮৩ শতাংশ) প্রতিদিন ২ ঘণ্টার বেশি সময় স্ক্রিন ব্যবহার করে।
-
গড়ে প্রতিটি শিশু দিনে প্রায় ৪.৬ ঘণ্টা স্মার্টফোন, টেলিভিশন, ট্যাবলেট, কম্পিউটার বা গেমিং ডিভাইসে সময় কাটায়।
-
এই সময় বিশ্ব স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সুপারিশকৃত বিনোদনমূলক স্ক্রিন টাইমের সীমার দ্বিগুণেরও বেশি।
কমছে ঘুম, বাড়ছে শারীরিক সমস্যা
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে শিশুদের ঘুমের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাচ্ছে।
যেসব শিশু দিনে ২ ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন ব্যবহার করে, তারা গড়ে মাত্র ৭.৩ ঘণ্টা ঘুমায়। অথচ এই বয়সী শিশুদের সুস্থ বিকাশের জন্য প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন।
এ ছাড়া গবেষণায় দেখা গেছে—
-
এক-তৃতীয়াংশের বেশি শিশু চোখের সমস্যায় ভুগছে।
-
প্রায় ৮০ শতাংশ শিশুর নিয়মিত মাথাব্যথার অভিযোগ রয়েছে।
-
প্রায় ১৪ শতাংশ শিশু অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতায় আক্রান্ত এবং বেশি স্ক্রিন ব্যবহারকারীদের মধ্যে এই হার আরও বেশি।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শিশুদের স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ, শেখার ক্ষমতা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, শারীরিক বৃদ্ধি এবং মানসিক সুস্থতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি পাঁচজন শিশুর মধ্যে প্রায় দুইজন দুশ্চিন্তা, অতিচঞ্চলতা অথবা আচরণগত সমস্যার মতো অন্তত একটি মানসিক সমস্যায় ভুগছে।
গবেষকদের মতে, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে—
-
ঘুমের স্বাভাবিক চক্র ব্যাহত হয়।
-
শারীরিক খেলাধুলা ও ব্যায়াম কমে যায়।
-
চোখের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে।
-
মনোযোগ কমে যায়।
-
শিশুদের সামাজিক মেলামেশা ও পারিবারিক যোগাযোগ কমে গিয়ে মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
গবেষণার প্রধান গবেষক ও আইসিডিডিআর,বি-র অ্যাসিস্ট্যান্ট সায়েন্টিস্ট ডা. শাহরিয়া হাফিজ কাকন বলেন, শিশুদের দেরিতে ঘুমানো, নিয়মিত মাথাব্যথা, চোখে অস্বস্তি, অতিরিক্ত খিটখিটে আচরণ, একাকীত্ব, খেলাধুলায় অনীহা কিংবা মনোযোগ কমে যাওয়ার মতো লক্ষণকে অবহেলা করা উচিত নয়। এগুলো অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের ইঙ্গিত হতে পারে।
চোখের সুরক্ষায় গবেষকরা ২০-২০-২০ নিয়ম অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন। অর্থাৎ প্রতি ২০ মিনিট স্ক্রিন ব্যবহারের পর অন্তত ২০ সেকেন্ড ২০ ফুট দূরের কোনো বস্তুর দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে।
অভিভাবকদের করণীয়
আইসিডিডিআর,বি-র নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ বলেন, ডিজিটাল প্রযুক্তি এখন জীবনের অংশ হলেও শিশুদের সুস্থ বিকাশের জন্য স্ক্রিন ব্যবহারের সীমা নির্ধারণ করা জরুরি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী, স্কুলগামী শিশুদের বিনোদনমূলক স্ক্রিন টাইম প্রতিদিন ২ ঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত।
তিনি অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানান, শিশুদের—
-
বাইরের খেলাধুলায় অংশ নিতে উৎসাহিত করা,
-
নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম করানো,
-
পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা,
-
পরিবারে ডিভাইসমুক্ত সময় কাটানো,
-
বই পড়া, বিতর্ক, দলগত পড়াশোনা, লাইব্রেরিতে যাওয়া এবং গাছের যত্ন নেওয়ার মতো সৃজনশীল কাজে যুক্ত করার।
সচেতনতাই সমাধান
গবেষকদের মতে, প্রযুক্তি পুরোপুরি বন্ধ করা বাস্তবসম্মত নয়। বরং শিশুদের মধ্যে স্বাস্থ্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ ডিজিটাল অভ্যাস গড়ে তোলাই সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।
এ জন্য পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের জন্য সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং ব্যবহারিক নির্দেশিকা চালুরও পরামর্শ দিয়েছেন গবেষকরা।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!